সয়াবিনের উত্তাপ সরিষার বাজারে: দেশের অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারের হালচাল
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা যেন কাটছেই না। সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এবার দেশের বাজারে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরিষার তেলের দাম। ঢাকার বাজারগুলোতে প্রতি কেজি সরিষার তেলের দাম প্রকারভেদে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। রাজধানীতে যেমন স্থায়ীভাবে মেশিনে তেল ভাঙানোর দোকান রয়েছে, তেমনি অলিগলিতে ভ্রাম্যমাণ মেশিনেও ক্রেতার চোখের সামনে সরিষা ভেঙে তেল বিক্রি করা হয়। সবখানেই এখন বাড়তি দামের উত্তাপ।
অস্থির স্থানীয় বাজার ও ক্রেতাদের ভোগান্তি
বর্তমানে স্থানীয়ভাবে মেশিনে ভাঙানো সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায়। আর একটু ভালো মানের বা ঘানি ভাঙানো তেল কিনতে হলে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা। অথচ বছরখানেক আগেও চিত্রটা এমন ছিল না; তখন মেশিনে ভাঙা তেলের কেজি ছিল ১৮০ টাকার আশেপাশে। সেগুনবাগিচা, ফকিরাপুল, মালিবাগ ও শান্তিনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সরিষার তেল এখন ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং পাঁচ কেজির বোতল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
সেগুনবাগিচায় তেল কিনতে আসা সাবিহা খাতুন জানালেন তাঁর হতাশার কথা। রোজার আগে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকটের সময় তাঁরা সরিষার তেলে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু গত ছয় মাসে ১৮০-২০০ টাকার তেল এক লাফে ২৮০ টাকায় পৌঁছেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “তেল ব্যবহারে কৃপণতা দেখিয়েও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারছি না। বাচ্চারা ভাজা-পোড়া খেতে চাইলেও উপায় খুঁজে পাই না।” বাজার তদারকির অংশ হিসেবে অবশ্য অভিযান চলছে; চট্টগ্রামে সয়াবিন তেলের দাম বেশি রাখায় একটি দোকানকে জরিমানাও করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কিন্তু সরিষার তেলের এই লাগামহীন দরে সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলছে না।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি ও কাঁচামালের সংকট
সেগুনবাগিচায় রাস্তার ধারে মেশিন বসিয়ে তেল বিক্রি করা সোলায়মানের মতে, সরিষার তেল কয়েক মাস আগেও ছিল শৌখিন পণ্য, যা মানুষ মূলত আচার বা ভর্তার জন্য কিনত। কিন্তু সয়াবিনের সংকটে মানুষ এখন রান্নার জন্য এই তেলের ওপর নির্ভর করছে। চাহিদার এই সুযোগে কোম্পানি ও পাইকারি বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সোলায়মান বলেন, “কী করব, আগে যে সরিষার মণ ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকা ছিল, এখন তা ৩৫০০ থেকে ৩৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনে তেল বানিয়ে বিক্রি করে আমাদেরও খুব একটা লাভ থাকছে না।”
বিশ্ববাজারে সয়াবিনের ভিন্ন চিত্র
দেশের বাজারে যখন ভোজ্যতেল নিয়ে হাহাকার, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সয়াবিনের লেনদেনে কিছুটা ভিন্ন হাওয়া বইছে। শুক্রবারের লেনদেনে সয়াবিনের দামে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যেখানে দর ২ থেকে ৩ সেন্ট বেড়েছে। এর আগে সয়াবিনের দরে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও তা কাটিয়ে উঠে ‘ক্যাশ বিন’-এর গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৯ ডলার ৮৫ সেন্টে। তবে সয়ামিলের ফিউচার প্রাইস মিশ্র অবস্থায় রয়েছে; সয়াবিন অয়েলের ফিউচার পয়েন্ট কিছুটা কমলেও সয়ামিলের দাম সামান্য বেড়েছে।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবসের ছুটির কারণে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ থাকলেও সন্ধ্যায় তা পুনরায় খোলার কথা রয়েছে। এদিকে রপ্তানি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সয়াবিনের মোট প্রতিশ্রুতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে ৩০.৬৩৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে, যা ইউএসডিএ-এর প্রাক্কলনের ৭১ শতাংশ। শিপমেন্টের গতিও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে।
অন্যদিকে, ব্রাজিলের ফসলের উৎপাদন নিয়ে নতুন পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর আপডেটের পর সাফ্রাস তাদের উৎপাদনের প্রাক্কলন ০.৫২ মিলিয়ন মেট্রিক টন বাড়িয়ে ১৭৯.২৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত করেছে। বিশ্ববাজারের এই ওঠানামা এবং সরবরাহের পরিসংখ্যান হয়তো ভবিষ্যতে দেশের ভোজ্যতেলের বাজারেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।