বিশ্বজুড়ে উট শিল্পের নতুন দিগন্ত: সৌদিতে পাসপোর্ট, অস্ট্রেলিয়ায় দুধের বাজার
ডিজিটাল যুগে উট: সৌদির অভিনব উদ্যোগ
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে উট পালন ও এর বাণিজ্যিকীকরণে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উট ও এর বহুমুখী পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে দেশগুলো এখন বেশ আধুনিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তনের হাওয়া সবচেয়ে বেশি লেগেছে সৌদি আরবে, যেখানে উট পালন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে প্রথমবারের মতো ‘উট পাসপোর্ট’ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। দেশটির পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের এই যুগান্তকারী উদ্যোগের মাধ্যমে পুরো খাতটিকে একটি নিশ্ছিদ্র কাঠামোর আওতায় আনা হবে। উপমন্ত্রী মনসুর বিন হিলাল আল-মুশাইতি ইতিমধ্যে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন।
বিশাল প্রাণিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা
মূলত প্রতিটি উটের সঠিক পরিচিতি নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ পাসপোর্টের নকশা করা হয়েছে। এতে উটের নাম, জন্মের তারিখ, জাত, লিঙ্গ, গায়ের রঙ থেকে শুরু করে জন্মস্থানের বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকছে। জালিয়াতি রোধে মাইক্রোচিপ নম্বর এবং উটের দুই পাশের ছবির পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি টিকাদান সূচিও যুক্ত করা হয়েছে সেখানে। পশুচিকিৎসকের স্বাক্ষর ও সিলসহ এই ডেটাবেজ উট কেনাবেচা, পরিবহন ও সরকারি নথি ব্যবস্থাপনায় কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ শুমারি বলছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশটিতে উটের সংখ্যা ছিল ২২ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৭টি। এত বিশাল সংখ্যক প্রাণীকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতেই এই আধুনিক ডিজিটাল পাসপোর্টের সূচনা।
আন্তর্জাতিক বাজারের খোঁজে অস্ট্রেলিয়ার খামারি
একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যখন উটের ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন আধুনিকায়ন চলছে, ঠিক অন্যদিকে হাজার মাইল দূরের অস্ট্রেলিয়ায় উটের দুধ নিয়ে তৈরি হচ্ছে আরেক বিস্ময়কর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সেখানকার এক খামারি পল মার্টিন পরিকল্পনা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে উটের দুধ রপ্তানি করার। অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল ডেজার্ট অঞ্চলে প্রায় পাঁচ লাখ বন্য উট ঘুরে বেড়ায়, যেখান থেকে আনা ‘ক্যারোলিন’ নামের একটি উট এখন মার্টিনের খামারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ব্রিসবেন মহানগরী থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে, কুইন্সল্যান্ডের সিনিক রিম এলাকার ৩২০ একরের (১৩০ হেক্টর) সবুজ খামারে ক্যারোলিন এবং তার মতো আরও অনেক উট এখন প্রতিদিন দুধ দিচ্ছে।
উটের মনস্তত্ত্ব ও আধুনিক প্রজনন
গত এক দশক ধরে স্থানীয় বাজারে উটের দুধ সরবরাহ করার পর মার্টিন এবার আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে নজর দিয়েছেন। চলতি বছরেই তিনি অন্তত ৬০ হাজার লিটার দুধ আমেরিকায় রপ্তানির আশা করছেন। বন্য উটের তুলনায় ক্যারোলিন প্রায় দ্বিগুণ দুধ দেয় বলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাতের প্রজননের জন্য এই প্রাণীটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মার্টিনের মতে, ঠিক দুইশ বছর আগে গরুর ডেইরি শিল্প যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, জেনেটিক সিলেকশনের দিক থেকে উট শিল্পের অবস্থানও এখন ঠিক সেখানেই। তবে উটের স্বভাব গরুর মতো নয়, তারা চাইলেই দুধ আটকে রাখতে পারে। তাই জোরজুলুম না করে উটগুলোকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুশি রাখার অভিনব কৌশল নিয়েছেন এই খামারি। দুধ দোয়ানোর সময় বাছুরের উপস্থিতি, পুরস্কার হিসেবে খাবার দেওয়া এবং এন্ডোরফিন নিঃসরণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে খামারে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা হয়।
সুপারফুড হিসেবে উটের দুধের কদর
হঠাৎ করে উটের দুধের এত আন্তর্জাতিক চাহিদা তৈরি হওয়ার পেছনে এর বেশ কিছু গুণাগুণ দায়ী। উটের দুধে গরুর দুধের মতো বিটা-ল্যাক্টোগ্লোবুলিন নামের প্রোটিন থাকে না, যা অনেকের জন্যই অ্যালার্জির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রাকৃতিকভাবেই হোমোজিনাইজড হওয়ার কারণে এই দুধ সহজে বরফ করা যায় এবং গলানোর পরও গুণগত মান ঠিক থাকে। ফলে বিপুল পরিমাণে জাহাজে করে তা বিদেশে পাঠানো বেশ সুবিধাজনক। অ্যালার্জি ছাড়াও ডায়াবেটিস বা একজিমার মতো স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষের কাছে পানীয় হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এই অনন্য প্রোটিনের প্রোফাইলটি এখন পরিচিতি পাচ্ছে নতুন এক ‘সুপারফুড’ হিসেবে, যা অন্ত্রের সুস্থতার জন্যও দারুণ কার্যকরী।