20 জানুয়ারি 2026

ইউরোপ সেরা হয়েও পিএসজির ছন্দপতন এবং পুরোনো আক্ষেপের দগদগে স্মৃতি

পার্ক দে প্রিন্সেসের গ্যালারিতে তখন পিনপতন নীরবতা। স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষ মুহূর্তে ভিটিনহার দূরপাল্লার শটটি যখন গোলবারের ওপর দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে উড়ে গেল, তখনই দর্শকদের মনে এক কঠিন সত্যের উদয় হলো। এই মৌসুমে অন্তত প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি) তাদের চিরচেনা নাটকীয় কায়দায় হার এড়াতে পারল না। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দলটির যে দাপট দেখানোর কথা ছিল, তা কি তবে ঝিমিয়ে পড়ছে? নাকি এটি কেবলই সাময়িক ছন্দপতন? সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে প্যারিসের ক্লাবটির বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

ভাগ্যের জোরে বারবার রক্ষা

গত কয়েক সপ্তাহে পিএসজিকে তাদের চেনা ছন্দে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ঠিকই প্রয়োজনীয় ফলাফল বের করে নিতে সক্ষম হয়েছিল লুইস এনরিকের শিষ্যরা। নভেম্বরের শুরুর দিকে লিঁওর মাঠে ২-২ গোলে ড্র হতে যাওয়া ম্যাচটিতে নাটকীয় জয় আসে স্টপেজ টাইমের পঞ্চম মিনিটে জোয়াও নেভেসের দুর্দান্ত হেডে। এক মাস পর রেলিগেশন অঞ্চলের দল মেটজের বিপক্ষেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাদের। সেবারও দ্বিতীয়ার্ধে ডেজিরে দুয়ের আচমকা এক গোলে ৩-২ ব্যবধানের কষ্টার্জিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

এমনকি কুয়েতে অনুষ্ঠিত ট্রফি দেস চ্যাম্পিয়ন্স ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্শেইয়ের বিপক্ষেও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল পিএসজি। যোগ করা সময়ে ২-১ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৯৫তম মিনিটে গনসালো রামোসের ভলিতে সমতায় ফেরে তারা এবং পরবর্তীতে টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে জয়ী হয়। গত পাঁচ মাসে এ নিয়ে তৃতীয়বার কোনো শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে টাইব্রেকারে জিতল প্যারিসের জায়ান্টরা। এর আগে টটেনহ্যাম হটস্পারের বিপক্ষে উয়েফা সুপার কাপ এবং ফ্ল্যামেঙ্গোর বিপক্ষে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপেও তারা একইভাবে স্নায়ুক্ষয়ী জয়ে শিরোপা ঘরে তুলেছিল।

মৌসুমের প্রথম বড় ধাক্কা

২০২৫ সালে পিএসজির অর্জনের ঝুলিতে জমা হয়েছে রেকর্ড ছয়টি ট্রফি। গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর যে মোমেন্টাম তৈরি হয়েছিল, তা কেবল ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে চেলসীর কাছে হারে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। এক সপ্তাহ আগেই ফ্রেঞ্চ কাপে (কুপ দে ফ্রান্স) প্রতিবেশী ক্লাব প্যারিস এফসির কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে এনরিকের দল। ২০১৪ সালের পর এই প্রথম শেষ ষোলোর আগেই বিদায় নিতে হলো তাদের। অজস্র সুযোগ নষ্টের মহড়ায় ভিটিনহার লক্ষ্যভ্রষ্ট শটটি ছিল সেই হতাশারই চূড়ান্ত প্রতীক।

গালতিয়ের আমল এবং গ্রুপ পর্বের সেই পুরোনো আক্ষেপ

বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের এই দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যেই মনে পড়ে যায় কয়েক মৌসুম আগের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা, যখন ক্রিস্তফ গালতিয়ের অধীনে গ্রুপ সেরা হতে না পারার আক্ষেপে পুড়েছিল প্যারিসের দলটি। সেবারও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গ্রুপ সেরা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিল পিএসজি, কিন্তু অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় তাদের পেছনে ফেলে দেয় বেনফিকা।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ‘এইচ’ গ্রুপের সেই ম্যাচে ইউভেন্তুসের মাঠে কিলিয়ান এমবাপে ও নুনো মেন্দেসের গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল পিএসজি। কিন্তু একই সময়ে বেনফিকা যখন ম্যাকাবি হাইফাকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয়, তখন সব সমীকরণ পাল্টে যায়। ম্যাচের ৯০তম মিনিট পর্যন্ত পিএসজি টেবিলের শীর্ষে থাকলেও, বেনফিকা শেষ মুহূর্তে আরেকটি গোল করে অ্যাওয়ে গোলের হিসাবে পিএসজিকে টপকে গ্রুপ সেরা হয়ে যায়।

হিসাবের মারপ্যাঁচ এবং কোচের হতাশা

সেবার দুই দলেরই পয়েন্ট ছিল সমান ১৪ এবং মুখোমুখি লড়াইয়ে দুটি ম্যাচই ১-১ ড্র হয়েছিল। গোল ব্যবধান (+৯) এবং মোট গোল (১৬টি) সমান হওয়ার পর, বেনফিকা অ্যাওয়ে ম্যাচে পিএসজির চেয়ে বেশি গোল করায় শীর্ষস্থান দখল করে।

কানাল প্লাসের সঙ্গে আলাপচারিতায় তৎকালীন কোচ গালতিয়ে নিজের হতাশা লুকাতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, “আমরা ম্যাকাবি হাইফার বিপক্ষে ৭-২ গোলে জেতার সময় ৯০তম মিনিটে খেলাটা একপ্রকার থামিয়ে দিয়েছিলাম। গ্রুপ পর্বে সেট-পিস থেকে আমরা অযথা অনেক গোল হজম করেছি। যদি আমরা একটি গোলও কম খেতাম, তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরের রাউন্ডে যেতে পারতাম।”

চ্যাম্পিয়নদের মানসিকতা

টানা চার আসরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর সেবার রানার্সআপ হয়ে বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল পিএসজিকে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের মতো দলের সম্ভাবনা ছিল। তবে এমবাপে এবং গালতিয়ে দুজনেই তখন একমত ছিলেন যে, ইউরোপ সেরা হতে হলে বড় দলগুলোকে হারানোর কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমান সময়ে পিএসজি ইউরোপের মুকুট মাথায় নিয়ে খেলছে ঠিকই, কিন্তু প্যারিস এফসির কাছে সাম্প্রতিক হার এবং মাঠের পারফরম্যান্সে অস্থিরতা আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নগুলো সামনে আনছে। অতীতে যেমন সামান্য ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে, বর্তমানেও কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা রক্ষণের দুর্বলতা তাদের বড় কোনো বিপদে ফেলবে? ড্রয়ের জন্য অপেক্ষা আর প্রতিপক্ষ নিয়ে ভাবনার চেয়ে পিএসজির এখন বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছন্দ দ্রুত ফিরে পাওয়া।

More Stories